সম্প্রীতির সংগঠনে বিভেদের বীজ বুনলো কারা ?

সম্প্রতি বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের নতুন একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে—এমন তথ্য উল্লেখ করে দেশের বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। ওই সব খবরে বলা হয়, ৫২ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে; তবে প্রাথমিকভাবে মাত্র ৯ জনের নাম প্রকাশ করা হয়। এতে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মাওলাকে সংগঠনটির সভাপতি হিসেবে দেখানো হয়।
তবে এসব সংবাদের ক্ষেত্রে কোনো গণমাধ্যমই সংগঠনটির অফিসিয়াল প্যাডে প্রকাশিত কমিটির নথিপত্র দেখাতে পারেনি। এদিকে কমিটি গঠনের এই খবরকে ‘ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের বর্তমান সভাপতি ও গণপূর্ত সচিব নজরুল ইসলাম। সংগঠনটির অফিসিয়াল প্যাডে দেওয়া তাঁর বিজ্ঞপ্তির পর প্রশাসনজুড়ে ও জনমনে প্রশ্ন উঠেছে—আসল সত্য কী?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে অনুসন্ধান চালায় দৈনিক বর্তমান সময়। অনুসন্ধানে উঠে আসে, কানিজ মাওলাকে সভাপতি করে যে কমিটি গঠনের কথা বলা হচ্ছে, তার কোনো আইনগত বা সাংগঠনিক ভিত্তি নেই। বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের ৫২ সদস্যের মধ্যে মাত্র চারজনের স্বাক্ষর নিয়ে এমন ‘পকেট কমিটি’ গঠনের সুযোগ সংগঠনটির গঠনতন্ত্রেও নেই।
এ নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ায় নানা প্রশ্ন উঠেছে। সাধারণত সংগঠনটির কোনো কমিটি গঠিত হলে অফিসিয়াল প্যাডে বিবৃতি দিয়ে তা জানানো হতো। অতীতের কমিটিগুলোতে দল-মত নির্বিশেষে অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে সাদা কাগজে নাটকীয়ভাবে ঘোষিত এই তথাকথিত কমিটি সংগঠনটির ইতিহাসে নজিরবিহীন।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ব্যক্তিগত ক্ষমতার ব্যবহার করতে মরিয়া হয়ে এক সাবেক সচিবের উসকানিতে সংগঠনটির দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও ধারাবাহিকতা ক্ষুণ্ন হচ্ছে। ওই সাবেক সচিবের অভিপ্রায়ে কয়েকজন তরুণ কর্মকর্তাকে ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের ‘বিএনপিপন্থী’ বলে ঢালাওভাবে প্রচার করা হচ্ছে। ফলে সম্প্রীতির এই সংগঠনের ভেতরে বিভেদের বীজ বপন করা হচ্ছে। প্রশাসানে তৈরি হচ্ছে নানা ধাচের রাজনৈতিক মেরুকরণ।
এর প্রভাবে একদিকে সংগঠনটির জৌলুশ ক্ষুণ্ন হচ্ছে, অন্যদিকে ভেঙে পড়ছে পারস্পরিক আস্থার চেইন অব কমান্ড। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পুরো জনপ্রশাসন; বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে জনমনে।
২৫ জানুয়ারি বিয়ামে কী হয়েছিল?
২৫ জানুয়ারি রাজধানীর বিয়ামে উপস্থিত ছিলেন—এমন একাধিক কর্মকর্তা বর্তমান সময়–কে নিশ্চিত করেছেন, সেদিন কমিটি গঠনের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে সংগঠনটিকে আরও গতিশীল করা, ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব এবং পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়। সভায় বর্তমান সভাপতি আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিকভাবে দায়িত্ব হস্তান্তরের কথাও বলেন।
এই সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে কয়েকজন তরুণ কর্মকর্তাকে উসকে দিয়ে সাদা কাগজে নয়জন কর্মকর্তার নাম লিখে একটি তথাকথিত কমিটি ঘোষণা করা হয়। সেখানে কানিজ মাওলাকে সভাপতি করে কমিটি গঠন হয়েছে—এমন সংবাদ বিজ্ঞপ্তিও ছড়ানো হয়। ভোটের আগে এমন তড়িঘড়ি করে কমিটি ঘোষণা বিএনপিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা ও জনরোষ তৈরির একটি কূটকৌশল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
‘কমিটিতে পদ থাকলেও জানেন না অনেকেই’
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই সাদা কাগজের কমিটিতে নাম থাকা অন্তত দুজন কর্মকর্তা নিজেরাই জানেন না যে তাঁদের কোনো পদ দেওয়া হয়েছে। মুষ্টিমেয় কর্মকর্তার এই কমিটি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রশাসনিক সার্ভিসের একাধিক সদস্য। তাঁদের ভাষায়,
“আমরা অনেকেই জানি না কী হচ্ছে, কীভাবে হলো। কারা কখন কীভাবে সভাপতি-সম্পাদক হলেন—সে সম্পর্কেও আমরা কিছুই জানিনা।”
‘কমিটি নেই, তবু খোলা হলো নেইমপ্লেট’
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার জেরে বিয়ামে সংগঠনটির বর্তমান সভাপতির নামফলক খুলে ফেলা হয়েছে। সেখানে বসানো হয়েছে সাদা কাগজের কমিটিতে ঘোষিত সভাপতি কানিজ মাওলার নামফলক। সাধারণত দায়িত্ব হস্তান্তরের পর এ ধরনের নামফলক পরিবর্তন করা হয়। কিন্তু এবার সেই প্রথাও লঙ্ঘন করা হয়েছে। নামফলক পরিবর্তনের ঘটনা নিয়েও প্রশাসনিক শিষ্টাচার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। সাবেক কর্মকর্তারা বলছেন, কোনো সংগঠনের সভাপতি পরিবর্তন হলে তা আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব হস্তান্তরের মাধ্যমে হয়। সেটি না করে জোরপূর্বক নামফলক সরানো একটি ‘অশুভ দৃষ্টান্ত’।
এক সাবেক যুগ্ম সচিব বলেন,
“এটা শুধু একটি নামফলক নয়; এটা একটি প্রথা, একটি শিষ্টাচার। এই প্রথা ভাঙা মানে ভবিষ্যতের জন্য ভুল বার্তা দেওয়া।”
সামনে কী হতে পারে
এ অবস্থায় সংগঠনটির ভেতরে দ্রুত একটি স্পষ্ট ও গঠনতন্ত্রসম্মত অবস্থান নেওয়ার দাবি উঠেছে। একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, বিষয়টি দীর্ঘায়িত হলে সংগঠনটির গ্রহণযোগ্যতা যেমন ক্ষুণ্ন হবে, তেমনি প্রশাসনের ভেতরে আস্থার সংকট আরও গভীর হবে।সংশ্লিষ্টদের মতে, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সাধারণ সভা ডেকে বিষয়টির নিষ্পত্তি করা এবং বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অবস্থান নেওয়াই এখন সবচেয়ে জরুরি।
তরুণ কর্মকর্তাদের ক্ষোভ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক তরুণ কর্মকর্তা বলেন, “আমরা প্রশাসনের ভেতরে শৃঙ্খলা ও ঐক্যের চর্চা দেখতে চাই। কিন্তু কোনো সাংগঠনিক প্রক্রিয়া ছাড়াই যেভাবে একটি তথাকথিত কমিটির কথা ছড়ানো হয়েছে, তাতে আমরা নিজেরাই বিভ্রান্ত। কমিটি হলে তা গঠনতন্ত্র অনুযায়ী হতে হবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।”
তাঁরা আরও বলেন, “সাদা কাগজে নাম লিখে কমিটি বানানো প্রশাসনিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী। এতে ব্যক্তিগত এজেন্ডা বাস্তবায়নের গন্ধ পাওয়া যায়। এর দায় পুরো সার্ভিসকে বহন করতে হচ্ছে, যা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়।”
তাঁদের অভিযোগ, হঠাৎ করে কর্মকর্তাদের ‘অমুকপন্থী-তমুকপন্থী’ বলে ট্যাগ দেওয়ার চেষ্টা চলছে, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক প্রবণতা। এতে একটি ঐতিহ্যবাহী প্রশাসনিক সংগঠনকে রাজনৈতিক বিতর্কে টেনে আনা হচ্ছে।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাবেক সিনিয়র সচিব বলেন, বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন কোনো হঠাৎ গড়ে ওঠা সংগঠন নয়। এখানে মুয়িদ সাহেবের মতো আমলারা দায়িত্ব পালন করেছেন, সাদত সাহেবের মতো অভিজ্ঞ ও মর্যাদাসম্পন্ন কর্মকর্তারা নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁরা এই সংগঠনকে ব্যক্তিগত স্বার্থ বা দলীয় চিন্তার ঊর্ধ্বে রেখে পরিচালনা করেছেন। সেই ঐতিহ্যই ছিল এই সংগঠনের শক্তি।
তিনি বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য—আজ আমরা সেই ঐতিহ্যকে ছেলেখেলায় পরিণত করছি। গঠনতন্ত্র উপেক্ষা করে সাদা কাগজে নাম লিখে কমিটি ঘোষণার প্রবণতা শুধু অনৈতিক নয়, এটি প্রশাসনিক শিষ্টাচারের সরাসরি লঙ্ঘন।
সাবেক এই সচিব আরও বলেন, এই সার্ভিসের শক্তি ব্যক্তিতে নয়, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয়। ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে তরুণ কর্মকর্তাদের ব্যবহার করা হলে এবং তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয়ের তকমা দেওয়া হলে পুরো জনপ্রশাসনই প্রশ্নের মুখে পড়ে। এটা তো কোন চোর দখল করার মতো করা যাবেনা; নিয়মনীতি মেনেই দায়িত্ব গ্রহণ এবং হস্তান্তর করতে হবে।
তিনি বলেন, এই ধরনের তৎপরতার ফলে প্রশাসনের ভেতরে বিভাজন তৈরি হচ্ছে। এতে চেইন অব কমান্ড দুর্বল হচ্ছে, পারস্পরিক আস্থা নষ্ট হচ্ছে। এর প্রভাব মাঠ প্রশাসন থেকে শুরু করে নীতিনির্ধারণী পর্যায় পর্যন্ত পড়ে।
সবশেষে তিনি বলেন, এখনই দায়িত্বশীল অবস্থান না নেওয়া হলে এবং গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বিষয়টির সমাধান না হলে এই ঐতিহ্যবাহী সংগঠন তার গ্রহণযোগ্যতা হারাবে—যা কারও জন্যই মঙ্গলজনক নয়।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের বর্তমান সভাপতি মোঃ নজরুল ইসলাম বলেন— বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন একটি গঠনতন্ত্রনির্ভর ও ঐতিহ্যবাহী সংগঠন। এখানে কোনো কমিটি গঠনের নির্দিষ্ট নিয়ম ও প্রক্রিয়া রয়েছে। সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে যে তথাকথিত কমিটির কথা প্রচার করা হচ্ছে, তার সঙ্গে সংগঠনটির কোনো সম্পর্ক নেই।
তিনি বলেন, সংগঠনটির কোনো নতুন কমিটি গঠিত হলে তা অফিসিয়াল প্যাডে লিখিত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সদস্যদের জানানো হয়। এ ক্ষেত্রে এমন কোনো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি। ফলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত কিছু তথ্য সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
নজরুল ইসলাম আরও বলেন, আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে সংগঠনটি পরিচালনার চেষ্টা করেছি। প্রশাসনের ভেতরে ঐক্য ও শৃঙ্খলা বজায় রাখাই এই সংগঠনের মূল লক্ষ্য। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু তৎপরতার কারণে অযথা বিভ্রান্তি ও বিভাজন তৈরি করা হচ্ছে। আমি প্রত্যাশা করবো এই বিভেদ ভুলে সবাই নির্ধারিত সময় অবধি কাধে কাধ মিলিয়ে সদস্যদের জন্য কাজ করবো।
এদিকে এ বিষয়ে কানিজ মাওলার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এআই












