প্রবাসীদের পোস্টাল ব্যালট নিয়ে ষড়যন্ত্রের শেষ কোথায়?

প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার কথা বলে যে পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, তা আজ নতুন করে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। কারণ, এই ব্যবস্থার ভেতরেই এমন কিছু অসঙ্গতি ও পক্ষপাতমূলক আচরণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যা একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ধারণাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। প্রবাসীদের পোস্টাল ব্যালট পেপার জামায়াত নেতাদের বাসা থেকে উদ্ধার হওয়ার ঘটনাটি নিছক একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি একটি বৃহত্তর পরিকল্পনার ইঙ্গিত বহন করে।
এই ঘটনায় মূল প্রশ্ন হলো—এই দায় কি সরকার ও নির্বাচন কমিশন চাইলেই এড়াতে পারে? উত্তর একটাই—পারে না। কারণ, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের দায়িত্বই হলো ভোটের প্রতিটি ধাপ সুরক্ষিত রাখা এবং ভোটারদের আস্থার জায়গা অটুট রাখা। সেখানে যদি ব্যালট পেপারই অনিরাপদ হয়ে পড়ে, তবে পুরো নির্বাচন ব্যবস্থাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
পোস্টাল ব্যালটের নকশার দিকে তাকালেই বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে। ব্যালটে দাঁড়িপাল্লা, শাপলা-কলি, হাতপাখার মতো প্রতীকগুলো এমনভাবে উপরের দিকে দৃশ্যমান স্থানে রাখা হয়েছে, যাতে চোখে পড়ে খুব সহজেই। অথচ বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকটি রাখা হয়েছে ব্যালটের ভাঁজের ভেতরে, এমন স্থানে যেখানে ব্যালট পুরোপুরি খুলে ভালোভাবে না দেখলে সেটি নজরেই আসে না। এটি কি নিছক কাকতালীয়? নাকি সচেতনভাবে করা একটি পরিকল্পিত সিদ্ধান্ত?
যারা মার্কেটিং ও ভোক্তা মনস্তত্ত্ব বোঝেন, তারা খুব সহজেই বুঝতে পারবেন এই ধরনের বিন্যাস কতটা কার্যকর হতে পারে। সাধারণভাবে সুপার শপে গেলে আমরা দেখি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যগুলো কখনোই প্রবেশদ্বারের কাছে রাখা হয় না। বরং সেগুলো এমন জায়গায় রাখা হয়, যেখানে পৌঁছাতে হলে ক্রেতাকে শপের অন্যান্য অনেক পণ্যের পাশ দিয়ে যেতে হয়। এর ফলে ক্রেতা অজান্তেই অন্যান্য পণ্যের দিকে আকৃষ্ট হয় এবং অতিরিক্ত কেনাকাটায় উদ্বুদ্ধ হয়।
একইভাবে, ক্যাশ কাউন্টারের আশেপাশে ছোট কিন্তু আকর্ষণীয় পণ্য সাজিয়ে রাখা হয়—যেমন চকলেট, চিপস বা ডিসকাউন্টেড আইটেম। সামান্য অপেক্ষার সময়েই ক্রেতার দৃষ্টি সেদিকে যায় এবং অনেক সময় অনিচ্ছাকৃত কেনাকাটাও হয়ে যায়। বিষয়গুলো খুব ক্ষুদ্র মনে হলেও, বাস্তবে এগুলো অত্যন্ত কার্যকর ও পরীক্ষিত কৌশল।
ঠিক এই মনস্তত্ত্বই পোস্টাল ব্যালটে প্রয়োগ করা হয়েছে বলে মনে হয়। বিএনপির প্রতীককে আড়ালে রেখে অন্য প্রতীকগুলোকে সামনে এনে ভোটারদের অবচেতন মনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। এর লক্ষ্য একটাই বিএনপি'র একনিষ্ঠ বিজয় ঠেকানো এবং নির্দিষ্ট কিছু দলকে তুলনামূলক সুবিধা দেওয়া।
সরকার, প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন কার হয়ে কাজ করছে, তা জনগণ বহুদিন ধরেই লক্ষ্য করে আসছে। নির্বাচন উপলক্ষে সেই ধারা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বর্তমান সরকার দায়িত্বে আসার পর থেকেই জনমনে ধারণা ছিল এটি মূলত জামায়াতের প্রভাবাধীন একটি সরকার। তবুও অনেক মানুষ আশাবাদী ছিলেন নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান নিয়ে, বিশেষ করে ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে নতুন রাজনৈতিক দল গঠিত হয়েছিল, তাদের নিয়ে।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেখা গেল, নির্বাচন সামনে আসতেই সেই নতুন দলটি জামায়াতের বি-টিম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল। এই বাস্তবতা দেশের সেই মানুষগুলো মেনে নিতে পারেননি, যারা গণঅভ্যুত্থানের পর বুকভরা আশা নিয়ে একটি নতুন, স্বচ্ছ ও জনমুখী রাজনীতির স্বপ্ন দেখেছিলেন।
এমনকি নতুন দলে যোগ দেওয়া অনেক সৎ ও দেশপ্রেমিক মানুষও এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে দল ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ডা. তাসনিম জারা—যিনি নতুন দলের প্রতি বিশ্বাস রেখে বিদেশের আরামদায়ক জীবন ত্যাগ করে দেশের জন্য কাজ করতে এগিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু প্রতারণা ও রাজনৈতিক আপসের বাস্তবতা বুঝতে পেরে শেষ পর্যন্ত দল ত্যাগ করেন।
এমন আরও অনেকেই রয়েছেন, যারা দেশের জন্য কিছু করার আশায় নতুন দলে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু অচিরেই বুঝতে পেরেছেন,এই দলটি নতুন করে রাষ্ট্র গঠনের পথে নয়; বরং এমন একটি রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, যাদের সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহু বিতর্ক, প্রশ্ন ও ইতিহাস জড়িত। এর ফলস্বরূপ তারা জনমন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানও দুর্বল করে ফেলেছে।
সবশেষে একটাই কথা বলার থাকে—নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও সরকার যদি নিজেদের নিরপেক্ষতা পূর্ণভাবে পুনরুদ্ধার না করে এবং জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে এই নির্বাচন দেশের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে না। বরং তা গণতন্ত্রকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করবে এবং মানুষের আস্থার শেষ অবশিষ্ট অংশটুকুও নষ্ট করে দেবে।
রায়হান রাহেল
সাংগঠনিক সম্পাদক
ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল

